পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

দলীয় নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, সরকারের বার্তা কী?

সরকার ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপির নেতাদের এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে দলীয়করণ ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

সরকার ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাদের। এর আগে কখনোই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, পর্ষদ ও করপোরেশনে একসঙ্গে এত রাজনীতিবিদকে নিয়োগ দিতে দেখা যায়নি।


সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বাইরে থেকে কাউকে নিয়োগ দিতে আইনি কোনো বাধা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব পদে আমলা নিয়োগ প্রচলিত একটি ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ডসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদদের বসানো হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সরকারের সময় এমন নিয়োগ হলেও তা ছিল সীমিত পরিসরে।


জনপ্রশাসনবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনীতিবিদদের নিয়োগের ভালো ফল আগে পাওয়া যায়নি। এখন দেখার বিষয়, নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা নিজ নিজ পদে কেমন ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি আইনে এমন নিয়োগের অতিরিক্ত সুযোগের অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।


নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেশ কয়েকজন রোববার নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদ নিয়োগের চিন্তাভাবনা চলছে।


বৃহস্পতিবার রাতে আলাদা প্রজ্ঞাপনে ১১টি সরকারি সংস্থা, পর্ষদ ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় গ্রেডের পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন তাঁরা।


দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগের সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এসব নেতার অনেকেই ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, কাউকে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এখন তাঁদের এভাবে মূল্যায়ন করা হলো।


বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দলের সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন।


বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন ও বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে সালাহ্উদ্দিন সরকারকে। তিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি।


বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামান।


বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।


এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন সামসুল আলম। তিনি এর আগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে অবসরে যান।


আমলাদের বাদ দিয়ে কেন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, এমন প্রশ্ন অনেকের।


বিএনপির নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে মোটা দাগে তিনটি কারণ জানা যায়। প্রথমত, আগের সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এসব নেতার অনেকেই ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, কাউকে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এখন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসিয়ে তাঁদের মূল্যায়ন করা হলো।


দুই. বর্তমান সরকার আমলাদের মধ্য থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে নিজেদের বিশ্বস্ত লোক পাচ্ছে না। তিন. সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান আগে আমলা দিয়ে পরিচালনা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।


বিষয়টি নিয়ে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার মনে করছে, প্রশাসনে যে গতি আসার কথা, তা আসছে না। তা ছাড়া বর্তমানে আমলাদের মধ্য থেকে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর মতো বিশ্বস্ত কাউকে পাওয়াও যাচ্ছে না। তাই নিয়োগে প্রচলিত ধারার বাইরে গেছে সরকার।


সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ ‘ভালো উদাহরণ নয়’ বলে মনে করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বা প্রভাব বিস্তার বাড়বে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল একসময় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। ওই সময় তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা না পেলেও পরে ওই সিটির মেয়রকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়। এখন তিনি পেলেন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার পদ।


প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি কর্মকর্তারা অনিয়ম করলে তাঁদের জবাবদিহি করার সুযোগ রয়েছে; পেনশন আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?


বেনজীর আহমেদ বিসিকের চেয়ারম্যান পদে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। বিসিক আইন ২০১৩–এর ১২(২) ধারা অনুযায়ী তাঁকে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই ধারায় বলা আছে, সরকার বিসিকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করবে। চেয়ারম্যান করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন।


বেনজীর আহমেদ বলেন, বিসিক অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও খুব একটা এগোতে পারেনি। দেশে অনেক বিসিক শিল্পনগরী করা হলেও কার্যকর করা যায়নি। অনেক জায়গায় প্লট নিয়ে ফাঁকা ফেলে রাখা হয়েছে। এখন সরকার চাইছে বিসিক কার্যকর হোক, এ কারণেই তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


বিসিসিটির নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু নিয়ে কাজ করা সরকারি এই সংস্থার অবস্থা ভালো নয় বলে শুনেছি। এমনও শুনেছি, আমলারা এখানে কোনো কাজ করেননি; সংস্থায় অনেক দেনা করে রেখে গেছেন। আমলারা অনেক সময় ঝুঁকি নিতে চান না, অনেক কিছুই করার সাহস পান না। জনগণের জন্য আমি কিছু করতে চাই। এই রুগ্‌ণ প্রতিষ্ঠানকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।’


সরকারি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগে সরকারকে প্রায় অবারিত সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) আইনে বলা আছে, চেয়ারম্যান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং তাঁর চাকরির শর্তাবলি সরকার ঠিক করে দেবে। এই আইনে নৈতিক স্খলনজনিত কারণে আদালতে দণ্ডিত, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত কিংবা চাকরিচ্যুত ব্যক্তি ছাড়া যে কাউকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে পারে সরকার।


জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড, তাঁত বোর্ডসহ অন্য যেসব সংস্থায় রাজনীতিবিদেরা নিয়োগ পেয়েছেন, সেসব ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইনে একই সুযোগ রাখা আছে।


সে কারণে এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক পরিচালক এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরের সরকারেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে একসঙ্গে এতজনকে দেওয়া হয়নি। এতে যেহেতু আইনগত বাধা নেই, তাই প্রশ্ন তোলারও সুযোগ নেই।


তবে এমন সুযোগ থাকা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করাই লক্ষ্য হয়, তাহলে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তি নিয়োগ দিয়ে কীভাবে ভালো ফল আশা করা যায়? আবার যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সংস্থাকে গতিশীল করতে আইনে এই সুযোগ রাখা হয়, তবে যোগ্যতার শর্তে তা থাকছে না কেন?


সাবেক একজন অর্থসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খাতভিত্তিক জ্ঞান না থাকার পরও রাজনীতিবিদদের এখন কী বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হলো, সেটা সরকারই ভালো জানে। তবে আগে অতিরিক্ত সচিবদের এসব সংস্থায় নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও দক্ষতার বিষয়টি বিবেচনা করা হতো না।


জনপ্রশাসনবিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আমলারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো চালান, নাকি রাজনীতিবিদেরা, সেটা এখন দেখার বিষয়। সরকার মূল্যায়ন করতে পারবে। রাজনীতিবিদেরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কমাতে, কাজের গতি বাড়াতে এবং সরকারি টাকার সাশ্রয় করতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

How did this article make you feel?

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.